ঋণ নেওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো

প্রতীকী ছবি।
প্রতীকী ছবি।

প্রকাশ :

সংশোধিত :

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অব্যাহত অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বা আগ্রহ ক্রমাগত কমছে।

মুদ্রাবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণের নিম্নমুখী চাহিদার পাশাপাশি, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাজার থেকে মার্কিন ডলার কেনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, যা বাণিজ্যিক ঋণদাতাদের ঋণ নেওয়ার আগ্রহ আরও কমিয়ে দিয়েছে।

এটি শেষ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা কাটিয়ে উঠে তাদের তারল্যের চাহিদা ও ঋণ গ্রহণ কমাতে সাহায্য করে, যারা সাধারণত নিজেদের চাহিদা মেটাতে আন্তঃব্যাংক বাজার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে যে কল-মানি লেনদেনের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদী ঋণ নেয়, তার মাসিক পরিমাণ মার্চ মাসে কমে ৯৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের সেপ্টেম্বর এবং ডিসেম্বরে যথাক্রমে ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা এবং ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো হলো আরেকটি প্রধান হাতিয়ার, যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে তহবিল ধার করতে পারে।

তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সম্মিলিতভাবে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিল, কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে মাসিক ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমে ৯৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বরে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে।

২০২৬ সালের মার্চ মাসে এটি আরও কমে ৯৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে আসে।

অন্যদিকে, বিশেষ তারল্য সুবিধার মাধ্যমে, যার অধীনে অ্যাসিউর্ড লিকুইডিটি সাপোর্ট (এএলএস), অ্যাসিউর্ড রেপো (এআর) এবং ইসলামিক ব্যাংকস লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটির (আইবিএলএফ) মতো সাতটি ঋণ গ্রহণের সুযোগ (উইন্ডো) রয়েছে, গত বছরের জুলাই মাসে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সার্বিকভাবে ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল।

মাসিক ঋণ গ্রহণের এই পরিমাণ গত বছরের সেপ্টেম্বরে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা এবং এই বছরের মার্চ মাসে ৩৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় নেমে আসে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, টাকা-ডলার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক সংস্থা গত বছরের ১৩ জুলাই থেকে ব্যাংকগুলো থেকে মার্কিন ডলার কেনা অব্যাহত রেখেছে।

তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে (ফরেক্স মার্কেট) এ ধরনের হস্তক্ষেপের অধীনে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ পর্যন্ত বাজার থেকে ৫.৬৮ বিলিয়ন ডলার কিনেছে এবং ব্যাংকগুলোতে ৬৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি সরবরাহ করেছে।

"এই হস্তক্ষেপ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহণের প্রবণতা কমার ক্ষেত্রে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে," তিনি বলেন।

তিনি আরও বলেন, আসলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন তাদের উদ্বৃত্ত তারল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) নামক আমানত ব্যবস্থায় জমা রাখছে, যদিও কল মানি রেট প্রায় ১০ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে লাভের হার ৭.৫০ শতাংশে বেশ কম।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসডিএফ-এ ব্যাংকগুলোর জমা রাখা তহবিলের মাসিক পরিমাণ মার্চ মাসে বেড়ে ৫৭৮ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৪২৪ বিলিয়ন টাকা।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা ক্রমাগত কমছে, যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে ৬.০৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের মতো বিভিন্ন কারণে শিল্প কারখানাগুলো তাদের কার্যক্রমে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সাম্প্রতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।

"সুতরাং, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের পথগুলো ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। যে কারণে তাদের ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমছে," অভিজ্ঞ এই ব্যাংকার যোগ করেন।

সর্বশেষ খবর